dua-for-a-blissful-family-by-netseba

স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের জন্য দোয়া এবং পরিবার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

5
(103)

কুরআন হাদীসে স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

ইসলাম একজন মুসলিমের জীবনকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করার জন্য একটি পরিপূর্ণ এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থা প্রদান করেছে। বিশেষত পরিবার সম্পর্কিত বিষয়গুলোর প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গভীর এবং বিশদ। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, সন্তানদের সঠিক শিক্ষা, এবং মুত্তাকীদের নেতা হওয়ার দোয়া কুরআন ও হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হয়েছে।

১. কুরআনে পরিবার এবং সন্তানের গুরুত্ব

স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের জন্য দোয়া এবং পরিবার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: আল-কুরআনে পরিবার সম্পর্কিত বহু আয়াত রয়েছে, যা আমাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব এবং তাদের সঠিক গঠন সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। সুরা ফুরকান এর ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

“رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَ ذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَ اجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا”

অর্থ: “হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।” (সুরা আল ফুরকান, ২৫:৭৪)

এই আয়াতটি পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, একজন মুসলিম শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে নিজের ইহকালীন জীবন সুখময় করতে প্রার্থনা করে না, বরং সে চায় যে, তার পরিবার ও সন্তান যেন তার জীবনের আনন্দ এবং শান্তির উৎস হয়। এর সাথে সাথে, সে চায় যে তার সন্তানরা ঈমানী জীবন যাপন করুক এবং সে তাদের জন্য আল্লাহর পথ অনুসরণের জন্য একটি আদর্শ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠুক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হল সুরা আলে ইমরান (৩:৩৪): “وَالۡمُؤۡمِنَٰتُ وَالۡمُؤۡمِنُونَ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍ”
অর্থ: “এবং মুসলিম পুরুষ এবং মুসলিম নারী একে অপরের সহায়ক।”

এখানে আল্লাহ নারী-পুরুষের মধ্যে সহায়তা এবং একে অপরের জন্য একজন ভালো বন্ধু হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই আয়াতটি শুধু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য নয়, বরং সন্তানদের জন্যও একটি শিক্ষা, যাতে তারা নিজেদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলে।

২. হাদীসের আলোকে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্বের গুরুত্ব

পবিত্র হাদীসেও স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বের কথা বারবার বলা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন:

“تمَامُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَأَبَرُّهُمْ بِأَهْلِهِ”
(সুনান তিরমিজি, হাদীস নং ৩৬৩৬)
অর্থ: “বিশ্বাসে পূর্ণ মুসলিম সেই, যার চরিত্র ভালো এবং সে তার পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ করে।”

এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একজন মুসলিমের ইমান পূর্ণতা পায় যখন সে তার পরিবার বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণ করে। নবী (সাঃ) এর এই শিক্ষা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং পরিবারের সুখী ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

৩. সন্তানদের সঠিক গঠন এবং শিক্ষা দান

সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন: “كلّكم راعٍ وكلّكم مسؤولٌ عن رعيته”
(সহীহ বুখারি, হাদীস নং ৮৫৩)
অর্থ: “তোমরা সবাই এক একজন শাসক, এবং প্রত্যেকে তার অধীনে থাকা মানুষদের জন্য জবাবদিহি করবে।”

এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে আমাদের জানান দিচ্ছে যে, সন্তানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শুধু তাদের খাদ্য ও বস্ত্র প্রদান করা নয়, বরং তাদের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষাও প্রদান করা। তারা যেন আল্লাহর পথে চলতে পারে, সেটি আমাদের দায়িত্ব।

এছাড়া, হযরত আলী (রাঃ) বলেন:

“প্রথমে তোমরা তোমাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা দাও, তাদের হৃদয়ে নৈতিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করো, তখনই তারা সঠিক পথে চলবে।”

এটি প্রমাণিত হয় যে, সন্তানদেরকে সঠিক পথের প্রতি অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে বড় করা একজন পিতার জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। একজন মুসলিম পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের জন্য এমন শিক্ষা ও চরিত্র তৈরি করতে চায়, যা তাদের পরবর্তী জীবনে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করবে।

৪. মুত্তাকী নেতা হওয়ার প্রার্থনা

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, “আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন”। এটি মুসলিমদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দোয়া, যেখানে তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে যেন তাদের জীবন ও নেতৃত্ব ঈমানী ও তাকওয়া ভিত্তিক হয়। সুরা আলে ইমরান (৩:১৭৪)-এ আল্লাহ বলেন:

“إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ”
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা তাঁর পথে যুদ্ধ করেন সজ্জিত হয়ে, যেন তারা একটি শক্তিশালী প্রাচীর।”

এটি নির্দেশ দেয় যে, একজন মুসলিম নেতা তার দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহর পথে সাহসিকতার সাথে এগিয়ে চলে এবং তার নেতৃত্বে সবাই ঈমানী পথে চলতে পারে।

উপসংহার:

এই আয়াত এবং হাদীসগুলি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একজন মুসলিম শুধু তার পার্থিব জীবনে সুখী হতে চায় না, বরং সে চায় তার পরিবারও আল্লাহর পথে চলুক। স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার জীবনকে সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ করতে পারে। এই দোয়াটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের পরিবার, চরিত্র এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাকওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। ইসলামে পরিবার এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্বের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মুসলিম পুরুষদের জন্য স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, সন্তানদের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান এবং তাদের চরিত্র গঠনের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, মুসলিমরা নিজের জীবন এবং নেতৃত্বে তাকওয়া ও আল্লাহর বিধান অনুসরণ করার জন্য সর্বদা প্রার্থনা করতে হবে।
পরিবারের সুখী পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে একজন মুসলিম সমাজে সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম হতে পারে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 103

No votes so far! Be the first to rate this post.

As you found this post useful...

Follow us on social media!